অ্যাসাইনমেন্ট তােমার দেখা কোনাে ঐতিহাসিক নিদর্শন (যেমনঃ প্রাচীন মসজিদ/মন্দির,জমিদার বাড়ি, মুদ্রা, শিলালিপি ইত্যাদি)ইতিহাসের কোন ধরনের উপাদান বিশ্লেষণপূর্বক ইতিহাসপাঠের প্রয়ােজনীয়তা মূল্যায়ন কর।
শিখনফলঃ
*ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারণা, স্বরূপ ও পরিসর ব্যাখ্যা করতে পারব।
*ইতিহাসের উপাদান ও প্রকারভেদ বর্ণনা করতে
পারব; ইতিহাস পাঠের প্রয়ােজনীয়তা আলােচনা করতে পারব;
নির্দেশনাঃ
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা;
ইতিহাস রচনার উপকরণসমূহ (লিখিত, অলিখিত,
সাহিত্যিক,প্রত্নতাত্ত্বিক প্রভৃতি) লিপিবদ্ধ করা;
ইতিহাসের গুরুত্ব বর্ণনা করা;
বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ইতিহাস চর্চার
প্রয়ােজনীয়তা উল্লেখ করা।
২০২২ সালের এসএসসি বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা এসাইনমেন্ট ৬ষ্ঠ সপ্তাহের এসাইনমেন্ট সমাধান ২০২১
ক) ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ব্যাখ্যাঃ
ইতিহাস শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ হলাে, ইতিহ + আস। যার অর্থ এমনই ছিল বা এরূপ ঘটেছিল। ড. জনসনের মতে, ‘যা কিছু ঘটে তাই ইতিহাস। যা ঘটে না তা ইতিহাস নয়।
অর্থাৎ সমাজে ও রাষ্ট্রে নিরন্তর বয়ে যাওয়া ঘটনা প্রবাহই ইতিহাস ই.এইচ.কার-এর মতে, ইতিহাস হলাে বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক অন্তহীন সংলাপ। গ্রীক শব্দ হিস্টরিয়া’ (Historia) থেকে ইংরেজি হিস্ট্রি’ (History) শব্দটির উৎপত্তি, যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ইতিহাস। হিস্টরিয়া’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন ইতিহাসের জনক গ্রিক ঐতিহাসিক হেরােডােটাস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে।
তিনিই প্রথম তাঁর গবেষণাকর্মের নামকরণে এ শব্দটি ব্যবহার করেন যার আভিধানিক অর্থ হলাে সত্যানুসন্ধান বা গবেষণা। তাঁর মতে, ইতিহাস হলাে যা সত্যিকার অর্থে ছিল বা সংঘটিত হয়েছিল তা অনুসন্ধান করা ও লেখা। ‘ইতিহাস’
শব্দটির উৎপত্তি ইতিহ’ শব্দ থেকে যার অর্থ ঐতিহ্য।
ঐতিহ্য হচ্ছে অতীতের অভ্যাস, শিক্ষা, ভাষা, শিল্প,
সাহিত্য-সংস্কৃতি যা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত থাকে। এই ঐতিহ্যকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় ইতিহাস।
বর্তমানের সকল বিষয়ই অতীতের ক্রমবিবর্তন ও অতীত ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আর অতীতের ক্রমবিবর্তন ও ঐতিহ্যের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণই হলাে ইতিহাস। তবে এখন ইতিহাসের পরিসর সুদূর অতীত থেকে বিরাজমান বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত।
খ) ইতিহাস রচনার উপকরণ:
যে সব তথ্যের উপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, তাকেই ইতিহাসের উপকরণ বলা হয়। সঠিক ইতিহাস লিখতে ঐতিহাসিক উপকরণের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসের উপকরণ ২ ধরনের।
• লিখিত উপকরণ।
•অলিখিত উপকরণ
লিখিত উপকরণঃ ইতিহাস রচনার লিখিত উপকরণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। প্রাচীন সময়ের কিছু তথ্য বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও পাওয়া যায়। যেমন: বেদ, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কলহনের রাজতরঙ্গিনী’ মিনহাজ-উস-সিরাজের ‘তবকাত-ই-নাসিরী’, আবুল ফজল-এর ‘আইন-ই-আকবরী’ ইত্যাদি।
পাঁচ থেকে সাত শতকে চৈনিক পরিব্রাজক ফাহিয়েন, হিউয়েন সাং ও ইৎসিং এর বর্ণনায় এবং পরবর্তীতে ইবনে বতুতা সহ বিদেশী পর্যটকদের বর্ণনায়ও তকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, আচারঅনুষ্ঠান সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়।
সাহিত্য উপকরণঃ
ক) জীবনী গ্রন্থঃসন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী ইত্যাদি।
খ)দেশীয় সাহিত্যঃ কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী, কালিদাসের মেঘদূত ইত্যাদি।
গ) বিদেশীদের বিবরণীঃ মেগাস্থিনিসের ‘ইণ্ডিকা’, ফা- হিয়েনের ‘ফো-কুয়াে-কিং, হিউয়েন সাং এর ‘সি-ইউ-কি’ ইত্যাদি।
ঘ)প্রাচীন ধর্মগ্রন্থঃ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ
ইত্যাদি।
ঙ)প্রাচীন পাণ্ডুলিপিঃসন্ধি-চুক্তি, কৌটিল্যের
অর্থশাস্ত্র ইত্যাদি।
অলিখিত উপকরণঃ
প্রত্নতাত্ত্বিক যেসব বস্তু বা উপকরণ থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই, সেই বস্তু বা উপকরণই প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনসমূহ মূলত অলিখিত উপকরণ।
ক) লিপিমালাঃ *সরকারি লিপিঃ যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার আদেশ, রাজা রাজ্য জয়, রাজত্বকাল, ধর্ম বিশ্বাস ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। *বেসরকারি লিপি এগুলাে সাধারণত পাথরে মন্দিরের গায়ে লেখা হতাে।
খ) মুদ্রাঃ মুদ্রায় রাজার নাম, সন-তারিখ, রাজার মূর্তি, নানা দেব-দেবীর মূর্তি খােদাই করা থাকত। যা থেকে রাজার সময়কাল, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সমাজব্যবস্থা ও ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গ) স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধঃপ্রত্নকেন্দ্র থেকে
প্রাপ্ত প্রাচীন সমাধি, স্তম্ভ, স্মৃতিস্তম্ভ, প্রাচীন শিল্পকীর্তি, দেব-দেবীর মূর্তি, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র ও
তৈজসপত্রাদি প্রাচীন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
হিসেবে চিহ্নিত।
ঘ) প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বং শেষঃ বগুড়ার মহাস্থানগড়,
নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর ইত্যাদি।
ঙ) প্রচলিত বিশ্বাস বা প্রথাঃ অতিকথন, রূপকথা, গান, কাহিনিমালা ইত্যাদি।
চ)পুঁথিঃএকসময় পুঁথিও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা- নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রাচীন অধিবাসীদের সভ্যতা, ধর্ম, জীবনযাত্রা, নগরায়ন, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, ব্যবসা- বাণিজ্যের সম্পর্কে।
গ)ইতিহাসের গুরুত্বঃ
মানবসমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের গবেষণালব্ধ সত্যের উপস্থাপনই ইতিহাস। ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে আমরা মানবসমাজের ক্রমবিকাশ ও সভ্যতার বিবর্তনের ধারা সম্পর্কে জানতে পারি। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং ব্যক্তির প্রয়ােজনে ইতিহাস পাঠ অত্যন্ত জরুরি।
জ্ঞান ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতেঃ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য অতীতের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা প্রয়ােজন। নিজ দেশ-জাতির সফল সংগ্রাম ও গৌরবময় ঐতিহ্য মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী, জাতীয়তাবােধ, জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণে ইতিহাস পাঠের বিকল্প নেই।
সচেতনতা বৃদ্ধি করেঃ ইতিহাস জ্ঞান মানুষকে সচেতন করে তােলে। সভ্যতার বিকাশ ও উত্থান-পতনের কারণগুলাে জানতে পারলে মানুষ ভালাে-মন্দের পার্থক্য সহজেই বুঝতে পারে কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে।
দৃষ্টান্তের সাহয্যে শিক্ষা দেয়ঃ ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে অতীত ঘটনাবলীর দৃষ্টান্ত থেকে মানুষ শিক্ষা নিতে পারে। সেই শিক্ষা বর্তমানের প্রয়ােজনে কাজে লাগানাে যেতে পারে। আর একারণেই ইতিহাসকে বলা হয় শিক্ষণীয় দর্শন।
সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস পাঠ করে যে জ্ঞান লাভ হয়, তা বাস্তব জীবনে চলার জন্য উৎকৃষ্টতম শিক্ষা।
ঘ) বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইতিহাস চর্চার প্রয়ােজনীয়তাঃ
একটি দেশের প্রতিটি সুনাগরিক তথা সচেত লােক মাত্রই ইতিহাস চর্চার প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। যেমন।
১) মানবসভ্যতা ও সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে জ্ঞান লাভঃ ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে মানুষ সমাজ থেকে শুরু করে তার যাবতীয় কর্মকাণ্ড, চিন্তাচেতনা ও জীবনযাত্রার অগ্রগতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারে
২। জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেঃ ইতিহাস আমাদের অতীত সম্পর্কে জানিয়ে দেয় আর বর্তমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়তা করে বলে সঠিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার জন্য ইতিহাস চর্চার প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে।
৩)জাতীয় চেতনার বিকাশঃ একটি জাতির ঐতিহ্য ও অতীত গৌরবান্বিত ইতিহাস ঐ জাতিকে বর্তমানের মর্যাদাপূর্ণ কর্মতৎপরতায় উদ্দীপিত করে বলে জাতীয় চেতনার উন্মেষের ক্ষেত্রে ইতিহাস চর্চার কোনাে বিকল্প নেই।
৪)জাতীয় পরিচয়: আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে জাতীয়তাবােধ গড়ে ওঠে। যা দেশ ও সমাজের উন্নতি তথা দেশেপ্রেমের জন্য একান্ত অপরিহার্য। তাই
জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে ইতিহাস চর্চার প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম।
৫) বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণে: বর্তমানে ঐতিহাসিক ঘটনার সঠিক আলােচনার ফলে ইতিহাস বন্ধনমুক্ত ও সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে। আর এ মুক্ত ইতিহাস আমাদের অতীত সময়ের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান
করে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণে সাহায্য করে।
এছাড়াও ইতিহাস একটি জাতির ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে। সমাজ ও জাতির অগ্রগতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে ইতিহাস জ্ঞান সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই মানবজীবনে ইতিহাস চর্চার প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম।

Leave a Comment