অ্যাসাইনমেন্ট : ইসলামের প্রাথমিক যুদ্ধ হিসেবে বদর ও উহুদ-এর প্রভাব। একটি বিশ্লেষণ
নির্দেশনা (সংকেত/ ধাপ/ পরিধি):
পটভূমিসহ বদর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ কারণ
বদর যুদ্ধের ফলাফল
উহুদ যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
উহুদ যুদ্ধের শিক্ষা
আলিম ইসলামের ইতিহাস ৪র্থ সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট সমাধান/ উত্তর 2021
পটভূমিসহ বদর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ কারণ
আল্লাহর পক্ষ থেকে কাফিরদের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ নাযিল হওয়ার পর থেকে মুসলিমগণ কাফিরদের সাথে অনেকগুলো যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এগুলোর মধ্যে কতকগুলো যুদ্ধে মহানবী (সা.) নিজে অংশগ্রহণ করেছেন, আবার অনেক যুদ্ধে
অভিজ্ঞ সাহাবীকে নিজের প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছেন।
যেসব যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং অংশ নিয়েছেন সেগুলো ‘গাযওয়া’ এবং যে সকল যুদ্ধে তিনি নিজে অংশ নেননি, সেগুলোকে ‘সারিয়া’ বলে। বেশির ভাগ গাযওয়া ছিল বড় আর সারিয়া ছিল ছোট। মহানবী (সা.)-এর জীবনে গাযওয়ার সংখ্যা ২৩টি আর সারিয়ার সংখ্যা ৪৩টি।
এ সকল যুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওয়াদা মুতাবিক মুসলিমদের বিজয় দান করেন। তবে উহুদ এবং হুনায়নের যুদ্ধে মুসলিমদের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। মুসলিমদের সমরনীতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য এ দুটি যুদ্ধে তাদের আল্লাহ তায়ালা
সাময়িক পরীক্ষায় ফেলেন। বদর যুদ্ধের কারণসমূহ মদিনা থেকে প্রায় আশি মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি বাণিজ্যকেন্দ্রের নাম বদর। তখনকার দিনে এখানে পানির প্রাচুর্য থাকায় স্থানটির গুরুত্ব ছিল অত্যাধিক। এখানেই
দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ রমযান মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ শুক্রবার ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটা বাহ্যত যুদ্ধ মনে হলেও বাস্তবে পৃথিবীর ইতিহাসে এর ফলে একটি সুমহান বিপ্লব সূচিত হয়েছিল। এ কারণেই
কুরআনের ভাষায় একে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ বলা
হয়েছে।
পাশ্চাত্যে ইতিহাসবিদরাও এর গুরুত্ব স্বীকার
করেন। ঐতিহাসিক পি কে হিট্টি তার গ্রন্থে একে ইসলামের প্রকাশ্য বিজয় বলে অভিহিত করেছেন। নিম্নে এ যুদ্ধের কারণসমূহ আলোচনা করা হলো:
কুরাইশদের গাত্রদাহঃ মদিনায় মুহাম্মদ (সা.)-এর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর এ ক্রমবর্ধিষ্ণু ক্ষমতা ও ইসলামের দ্রুত প্রসার কুরাইশদের মনে ঈর্ষা ও শত্রুতার উদ্রেক করে। তাই তারা মুহাম্মদ (সা.)-কে মদিনা থেকে
উৎখাতের ষড়যন্ত্র আঁটে।
মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রঃ পাপিষ্ঠ মুনাফিক দলের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইহুদিরা সংঘবদ্ধ হয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) তথা ইসলামের ধংস সাধনের জন্য গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে।
অর্থনৈতিক কারণঃ নির্বিঘ্নে ব্যবসায়-বাণিজ্য করার সুযোগ হারাতে হতে পারে, এ আশঙ্কায় কুরাইশরা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। ব্যবসায় ও মক্কার কাবা ঘরে গমনকারীদের চলাচল বন্ধ হলে সমূহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন
হবে উপলব্ধি করে কুরাইশরা ইসলামের মূলোৎপাটনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, “মক্কার ব্যবসায়ীরা সিরিয়া, মিসর, মেসোপটেমিয়া প্রভৃতি দেশের সাথে নিয়মিত ব্যবসায়-বাণিজ্য করতো, কিন্তু মদিনা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ফলে মদিনার মধ্য দিয়ে
কুরাইশদের একমাত্র বাণিজ্যপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।”
ইহুদিদে ষড়যন্ত্র ও শর্তভঙ্গঃ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্রমবর্ধমান প্রতিপত্তি ইহুদিরা সহ্য করতে পারেনি। তাই সুবিধাভোগী কিছু ইহুদি নেতা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুনাফিকদের সাথে মিশে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গ করে কুরাইশদের মদিনা আক্রমণে প্ররোচিত করে এবং রাসূলুল্লাহ
(সা.)-এর মহানুভবতা ও সহনশীলতার সুযোগে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে বদর যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়।
কুরাইশদের যুদ্ধের হুমকিঃ মদিনাবাসীদের
সঙ্গে মক্কার লোকদের বরাবরই ভালো সম্পর্ক ছিল, কিন্তু নবী করীম (সা.) ও তাঁর অনুসারীরা মদিনায় গেলে তাদের পূর্বের সে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। তাই কুরাইশরা মদিনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দেয়।
আবু সুফিয়ানের অপপ্রচারঃ মক্কার কুরাইশ কাফির নেতা আবু সুফিয়ান ব্যবসায় বাণিজ্যে আবরণে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়ায় গমণ করে। এ কাফিলায় প্রায় ৫০,০০০ দিনার মূল্যের ধন-রত্নাদি ছিল। নাখলার যুদ্ধে
বিপর্যস্ত হয়ে কুরাইশরা সিরিয়ায় গমনকারী কাফিলার মক্কায় নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। মক্কায় জনরব ওঠে, আবু সুফিয়ানের কাফিলা মদিনার মুসলিমদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। গুজবের সত্যতা যাচাই না করেই আক্রমণাত্মক নীতি অনুসরণ করে আবু জাহল এক হাজার সৈন্য নিয়ে আবু সুফিয়ানের সাহায্যার্থে বদর অভিমুখে রওয়ানা হয়।
কুরাইশদের দস্যুবৃত্তিঃ বদর যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে কুরাইশদের দস্যুবৃত্তিকে একটা বড় কারণ বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন। মদিনার সীমান্তবর্তী এলাকায় কুরাইশ এবং তাদের অনুগত সহযোগী আরব গোত্রগুলো মুসলিমদের শস্যক্ষেত্রে জ্বালিয়ে দিত, ফলবান বৃক্ষ ধ্বংশ করতে এবং উট, ছাগল ইত্যাদি অপহরণ করতো। সুতরাং এহেন কার্যকলাপের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
নাখলা প্রান্তরে খণ্ডযুদ্ধঃ
মদিনা সীমান্তে কুরাইশদের ক্রমবর্ধমান লুটতরাজ বন্ধ করার জন্য গোপন সংবাদ সংগ্রহে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের নেতৃত্বে একটি গোয়েন্দা দল দক্ষিণ আরবের নাখলায় প্রেরণ
করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ কাফিলাকে আক্রমণ করতে আদেশ না করা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ (রা) ভুলবশত কাফেলার সঙ্গে সংঘর্ষে রত হলে নাখলায় এক খণ্ডযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়।
যুদ্ধের ঘটনা মদিনা আক্রমণের জন্য মক্কার কাফিররা প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসছে- এ সংবাদে রাসূলুল্লাহ (সা.) খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় আল্লাহর এ নির্দেশ পেয়ে চিন্তামুক্ত হন। “আল্লাহর পথে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর, যারা
তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তবে সীমালঙ্ঘন করো না, কারণ আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ (১৭ রমযান দ্বিতীয় হিজরী)
রাসূলুল্লাহ (সা.) ২৫৬ জন আনসার এবং ৬০ জন মুহাজির নিয়ে যুদ্ধ সংক্রান্ত মন্ত্রণাসভার পরামর্শক্রমে গঠিত একটি মুসলিম বাহিনীসহ কুরাইশ বাহিনীর মোকাবেলার জন্য বেরমহন। মদিনা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর উপত্যকায় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে কুরাইশদের সংঘর্ষ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
আল-আরিসা পাহাড়ের পাদদেশে মুসলিম বাহিনীর শিবির স্থাপিত হয়। ফলে পানির কূপগুলো তাদের আয়ত্তে ছিল। ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিম সৈন্য সমাবেশের জন্য এমন এক স্থান বেছে নেন যেখানে সূর্যোদয়ের পর যুদ্ধ শুরু হলে কোনো মুসলিম সৈন্যের চোখে সূর্য কিরণ না পড়ে।” প্রাচীন আরব-রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে মল্লযুদ্ধ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে হযরত আমীর হামযা, আলী ও আবু ওবায়দা কুরাইশ নেতা ওতবা, শায়বা এবং ওয়ালিত ইবনে ওতবার সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এতে শত্রুপক্ষীয় নেতৃবৃন্দ শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হয়।।উপায়ন্তর না দেখে আবু জাহল নিজের বাহিনীসহ মুসলিম
বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা মুসলিমদের ওপর প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করতে লাগল, কিন্তু প্রতিকূল অবস্থা এবং সংঘবদ্ধ সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করা কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অসামান্য রণনৈপুণ্য, অপূর্ব বিক্রম ও অপরিসিীম নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে যুদ্ধ করে মুসলিমগণ বদরের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। অপরদিকে আবু জাহল ৭০ কুরাইশ সৈন্যসহ নিহত হয় এবং সমসংখ্যক কুরাইশ সৈন্য বন্দি হয়। এ যুদ্ধে মাত্র
১৪ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন।
বদর যুদ্ধের ফলাফল
বদর যুদ্ধ ইসলামের সর্বপ্রথম যুদ্ধ এবং অবিস্মরণীয় এক ঘটনা। মুসলিম শক্তি এ যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব জয়ের সোপানে আরোহণ করে। এ যুদ্ধে কুরাইশ শক্তিকে পর্যুদস্ত করে মুসলিমরা প্রথম বারের মতো বিশ্বময় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব
প্রমাণ করেন। এ যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী।ইসলামের প্রচার প্রসারের দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে ফলাফল আলোচনা করা হলোঐতিহাসিক যোসেফ হেল বলেন, “বদরের যুদ্ধ ইসলামের
ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের সামরিক বিজয়।”
এ যুদ্ধে কাফিরদের ওপর মুসলিমদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। বিশাল কাফির বাহিনী অল্পসংখ্যক মুজাহিদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এ যুদ্ধ বিজয়ের মাধ্যমে ইসলাম বিজয়ের যুগে প্রবেশ করে।
হিট্টির মতে, “বদরের প্রান্তরে সম্মুখ যুদ্ধে মুসলিমগণ মৃত্যুকে উপেক্ষা করে নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তা তাদের পরবর্তী বিজয়ের পথকে সুগম করে। এ বিজয় দ্বীনের সূচনা করে এবং পরবর্তী একশ বছরের মধ্যে ইসলাম পশ্চিম আফ্রিকা থেকে পূর্বে ভারত উপমহাদেশ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।”
বদরের যুদ্ধ মদিনা রাষ্ট্রকে সুসংবদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্রে
উন্নীত করে। বিজয়ীর বেশে মদিনায় ফিরে মহানবী (সা.) সুদক্ষ সমর নেতা, পরাক্রমশালী যোদ্ধা ও ন্যায়পরায়ণ শাসকে পরিণত হন। এমনকি বদর যুদ্ধে বিজয়ের ফলে মুসলিমদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়।
মুসলিমগণ প্রচুর গনীমত লাভ করে। এতে ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়। বদরের যুদ্ধের বন্দিদের সাথে রাসূল (সা.) মহত্ত্বপূর্ণ উদার আচরণ করেন। ফলে তাদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে। এতে ইসলামের নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয় সাধিত হয়। এ যুদ্ধ বিজয়ের মাধ্যমে বিজয়ের যুগে প্রবেশ করে। সর্বোপরি বদর যুদ্ধে স্বল্পসংখ্যক মুসলিম সেনার জয়লাভ ছিল একটি চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারক ঘটনা।
উহুদ যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল
মহানবী (সা.) এর জীবদ্দশায় কুরাইশ কাফিরদের সাথে মুসলিমদের সংগঠিত দ্বিতীয় যুদ্ধের নাম উহুদের যুদ্ধ। মদিনা থেকে তিন মাইল দূরে উহুদ পাহাড়। হিজরী তৃতীয় সালের শাওয়াল মাসে এ পাহাড়ের পাদদেশে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের কারণসমূহ নিম্নরূপ:
উহুদ যুদ্ধের কারণসমূহ
বদর যুদ্ধে অধিকাংশ কুরাইশ নেতার মৃত্যু সংবাদে সারা আরব জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে যায়। মক্কার অন্যতম নেতা আবু লাহাব এ দুঃসংবাদ শ্রবণে শয্যা গ্রহণ করে আর ওঠেনি। আবু সুফিয়ান প্রতিশোধের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে। সে বলতে লাগল, আমি যতদিন না এ পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারি, ততদিন
পর্যন্ত সুগন্ধ দ্রব্য ব্যবহার করব না, স্ত্রী স্পর্শ করব না। মোটকথা, কাফিররা স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলে ওঠে। বদর যুদ্ধে বিজয়ের পর মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে বনু হাশিম সম্প্রদায়ের ক্রমোন্নতি উমাইয়াদের অসহ্য হয়ে ওঠে। তাই কুরাইশদের দুটি শাখা হাশিমী ও উমাইয়ার মধ্যে শত্রুতা শুরু
হয়, যা কম-বেশি উহুদ যুদ্ধে ইন্ধন যোগাতে সাহায্য করে।
ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, বদরের বিপর্যয়ের পর ইহুদি কবি কাব বিন আশরাফ মক্কায় গমন করে কাব্য রচনা করে কুরাইশদের উত্তেজিত করতে থাকে। শুধু কুরাইশদেরই নয়,
বেদুইনদেরও সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে তৎপর হয়। ফলে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
আর ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, “বদরে বিপর্যয়ের পর আবু সুফিয়ান ৪০০ সৈন্যের এক
বাহিনী নিয়ে মদিনার সীমান্তে অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও ধংসলীলায় মত্ত হলে মুসলিমরা তা প্রতিহত করতে অগ্রসর হয়, আর এতেই উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।”
উহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলী
৩০০০ সৈন্য সমেত আবু সুফিয়ান মদিনা অভিমুখে অগ্রসর হয়। তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের ১৪ তারিখে মুহাম্মদ (সা.) জুমুআর সালাত আদায় করে সমবেত মুসলিমদের পরামর্শ সভায় বললেন, “এবার আমাদের নগর ছেড়ে দূরে গিয়ে যুদ্ধ করা সমীচীন হবে না। তাতে বিপদ ঘটতে পারে। তোমাদের মত কী?” বায়োজ্যেষ্ঠ মুহাজির ও আনসারগণ সকলে মহানবী (সা.)-এর মতে সাড়া দেন, কিন্তু এ প্রস্তাব তরুণ দলের মনঃপূত হয়নি। তারা এ ব্যবস্থাকে কাপুরুষতা মনে করে মদিনার বাইরে গিয়ে শত্রুর সম্মুখীন হওয়া সমীচীন ভাবে।
শেষে অনেকেই তাদের মত সমর্থন করে। হযরত মুহাম্মদ সকলকে রণসাজে সজ্জিত হতে নির্দেশ দেন। মোট এক হাজার সৈন্যের এ বাহিনীতে ২ জন মাত্র অশ্বারোহী, ৭০ জন বর্মধারী, ৪০ জন তীরন্দাজ, বাকি সকলেই বর্মহীন পদাতিক ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ৩০০ সৈন্য সমেত পথিমধ্য থেকে দলত্যাগ করে। উহুদ পাহাড়ের অপর পার্শে¦ গিয়ে রাসূল (সা.) একটি সুবিধাজনক স্থানে শিবির স্থাপন করেন- সম্মুখে যুদ্ধের ময়দান পেছনে পাহাড়। আবু সুফিয়ান তার
বিরাট বাহিনী নিয়ে পূর্বেই উহুদ প্রান্তরে অপেক্ষা করছিল। মুসলিম পক্ষের বামপার্শে পর্বতগাত্রে
একটি গিরিপথ ছিল। অনন্য সমরকুশলী মহানবী (সা.) এ গিরিপথের পশ্চাৎ দিক থেকে শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা)-এর নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি তীরন্দাজ বাহিনী মোতায়ন করেন এবং পরবর্তী
নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের সেখানে অবস্থান করার হুকুম দেন। উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়। মুসলিমদের হাতে শত্রু পক্ষের বহু সৈন্য হতাহত হলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই ময়দানে টিকতে না পেরে কুরাইশরা পালাতে আরম্ভ করে।
কুরাইশ সৈন্যদের পালাতে দেখে মুসলিমগণ পরিত্যক্ত সম্পদ মানে গনীমত সংগ্রহ করতে লেগে যায়। এ মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ ভুলে গিরিপথে নিয়োজিত তীরন্দাজ বাহিনীও গনীমত সংগ্রহে নেমে পড়ে। ৫০ জনের মধ্যে মাত্র দু’জন শেষ পর্যন্ত গিরিপথ পাহারায় নিযুক্ত থাকেন। দূর থেকে সুচতুর খালিদ এ দৃশ্য দেখে তার অশ্বারোহী সেনাদল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে দু’জন তীরন্দাজকে অনায়াসে পরাজিত ও নিহত করে পশ্চাৎ দিক থেকে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করে। পলায়নপর কুরাইশ সৈন্যরাও ফিরে আসে।
যুদ্ধ পুনরায় আরম্ভ হয়। বীরবর হামযা ও মুসয়াব শহীদ হন। মুসলিম সৈন্যগণ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। বহু সাহাবা হতাহত হন। এবার কুরাইশরা মহানবী (সা.)-কে লক্ষ্য করে তীর ও অন্যান্য অস্ত্র প্রয়োগ করতে থাকে। উহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর
সম্মুখের চারটি দাঁত মুবারক শহীদ হয় এবং ৭০ জন মুসলিম শাহাদাতবরণ করেন।
কুরাইশদের পক্ষে ২৩ জন নিহত হয়। কয়েকজন সাহাবী নিজেদের জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করে মহানবী (সা.)-কে রক্ষা করার জন্য ব্যূহ রচনা করেন। বহু তীর তাঁদের শরীর বিদ্ধ করে। যুদ্ধের মাঠে এ খবর রটে গেল, মুহাম্মদ (সা.) নিহত হয়েছেন। এতে বহু মুসলিম হতোদ্যম হয়ে পড়েন। হযরত তালহা কাঁধে করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তুলে নেন এবং তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এবার বিক্ষিপ্ত সাহাবাগণ আবার মহানবী (সা.)-এর চতুর্দিকে সমবেত হন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবাগণ যাঁরা মাঠে ছিলেন সকলে পর্বতে আরোহণ করেন। কাফিররা উঠতে চেয়ে ব্যর্থ হয়।
উহুদ যুদ্ধের ফলাফল
উহুদ যুদ্ধ মুসলিমদের জন্য ছিল ধৈর্যের অগ্নি পরীক্ষা। একথা সত্য, নিরবচ্ছিন্ন বিজয় কোনো জাতির ভাগ্যেই জুটে না। বিজয়ের আনন্দ ও পরাজয়ের গ্লানি সঙ্গী করেই বৃহত্তর সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে হয়। এজন্য প্রয়োজন ধৈর্যের। এ পরীক্ষায় মুসলিমগণ ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
ঈমানের দৃঢ়তাঃ যুদ্ধোত্তরকালে আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানে মুসলিমদের খাঁটি মুমিন হতে এবং হকের ওপর দৃঢ়পদ থাকতে নির্দেশ প্রদান করেন। এ যুদ্ধের ফলে মুসলিমদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেদিন যুদ্ধের প্রথম দিক জয় লাভ করেও পরবর্তীতে তাদের পরাজয় মেনে
নিতে হয়েছিল। তাই পরবর্তী যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেগুলোতে তারা মহানবী (সা.)-এর আদেশ নির্দেশ পুরোপুরি মেনেই যুদ্ধ করেছিলেন। ফলে বলা যেতে পারে, উহুদ যুদ্ধ মুসলিমদের জন্য ঈমানী পরীক্ষা হিসেবে কাজ করেছিল।
ইহুদিদের মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গের শাস্তিঃ ঐতিহাসিক পি.কে.হিট্টি বলেন, ইহুদি বনু নযির ও বনু কায়নুকা গোত্র মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গ করে কুরাইশদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার অপরাধে মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়।
জয় পরাজয়ের অভিজ্ঞতাঃ উহুদ রাণাঙ্গনে প্রাথমিকভাবে মুসলিমদের বিজয় এবং সে কারণে উল্লাস ও বিশৃঙ্খলাই পরবর্তীতে পরাজয়ে পর্যবসিত হয়। অপরদিকে কুরাইশরা আপাত জয়লাভ করলেও এর কোনো সুফল ভোগ করতে পারেনি; বরং নৈতিক দুর্বলতাহেতু মনোবল হারিয়ে ময়দান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
মুসলিমদের বীরত্ব বৃদ্ধিঃ
উহুদের পরাজয় মুসলিমদের বীরত্ব অধিকতর বৃদ্ধি করেছিল। মদিনায় প্রত্যাগমনের পর মহানবী (সা.) একদল সাহাবীকে মক্কাবাসী কুরাইশদের পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দেন। এতে তারা অতুলনীয় সাহস, মনোবল ও বীর্যবত্তার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
পরবর্তী বিজয়ের পথ উন্মোচনঃ উহুদ যুদ্ধ মুসলিমদের জন্য ছিল এক বিরাট শিক্ষা। উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী নেতার আদেশ মানা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, তাই পরবর্তীতে কোনো যুদ্ধেই তারা আর এ ভুল করেননি।
অতএব উহুদের পরাজয় মুসলিমদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের পথ উন্মুক্ত করেছিল। কাফিরদেই পরাজয় ঘটেঃ মুসলিমগণ যদি উহুদে পরাজিতই হতো, তাহলে কুরাইশরা মদিনা আক্রমণ করতো। কেননা মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যেই তারা এসেছিল। সুতরাং উহুদে তাদের পরাজয়ই হয়েছিল। কাফিররা সত্যিই যে মুসলিমদের ওপর জয়ী হতে পারেনি, আবু সুফিয়ান তা ভালোভাবে
বুঝেছিল। নতুবা যুদ্ধশেষে সে “আগামী বছর তোমাদের সাথে বুঝাপড়া হবে” কেন বলল?
উহুদ যুদ্ধের শিক্ষা
প্রথমত, মুসলিম তরুণরা রাসূল (সা.) ও অন্যান্য সাহাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে না পেরে মদিনা শহরের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন। যুদ্ধ জয় অপেক্ষা গনীমত সংগ্রহ প্রবণতাই অনেকের মধ্যে ছিল প্রবল। মহানবী (সা.)-এর কড়া হুকুম সত্ত্বেও তীরন্দাজদের স্থান ত্যাগই এর প্রমাণ।
নেতার আদেশ ও অভিমতের প্রতি এহেন অশ্রদ্ধা যে ভয়ঙ্কর দোষের, উহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণ তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল। এ যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ফলে পরবর্তীকালে কখনো এ ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। কাজেই বলতে হবে, অমঙ্গলের মধ্য দিয়ে মুসলিমদের মঙ্গল সাধিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শত্রুর শাণিত তরবারি মহানবী (সা.)-এর মস্তকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল; এমন দুর্যোগের মধ্যেও তিনি নেতার আদর্শ স্থাপন করেছিলেন, সংকট মুহূর্তেও তিনি বিচলিত হননি, কর্তব্য পালনে ভুল করেননি। বিক্ষিপ্ত মুসলিম সৈন্যদের তিনি একত্র করেছিলেন এবং তাঁর নৈতিক মনোবল রক্ষা করতে পেরেছিলেন।
এরূপ অবস্থায় পড়লে কিরূপ ধৈর্য ও ত্যাগ তিতিক্ষার প্রয়োজন, উহুদ যুদ্ধ বিপর্যয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর অনুসারীদের তা দেখিয়ে দিয়েছেন। তৃতীয়ত, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যদি মৃত্যু ঘটে তবে মুসলিমগণ কোন আলোকে এটা
গ্রহণ করবে- নির্দেশিত পথে চলবে নাকি উদভ্রান্তের নতো পথ চলবে, মুসলিমদের এ পরীক্ষাও এখানে দিতে হয়েছিল। সর্বোপরি, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে দোয়াকালাম, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ কবজ আর ওয়ায নসিহতই যথেষ্ট নয়। এ কাজে সমরনীতি, সমর কৌশল ও বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে সমরবিশেষে জীবনের বাজিও রাখতে হয়।

Leave a Comment