( ক ) ব্যাংকের ধারণা ব্যাখ্যা সাধারণভাবে ব্যাংক বলতে এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বুঝায় যার কাজ হলাে এক পক্ষের কাছ থেকে আমানত হিসাবে অর্থ জমা রাখা এবং অন্য পক্ষকে ঋণ দেওয়া বা বিনিয়ােগ করা । বাংলা ব্যাংক শব্দটি মূলত ইংরেজি Bank শব্দ থেকে এসেছে যার আবিধানিক অর্থ নদী বা জলাশয়ের তীর , লম্বা টুল বা বেঞ্চ কোন কিছুর স্তুপ বা ধনভান্ডার ইত্যাদি । মধ্যেযুগে ইটালির ইহুদী ব্যবসায়ীরা লম্বা টুল বা বেঞ্চে বসে টাকার ব্যবসা করত । এসব টুলকে অঞ্চলভেদে Banco , Bancus , Banc , Banca , Bangk ইত্যাদি নামে ডাকা হতাে । সেই ধারণা অনুযায়ী কেউ কেউ ব্যাংক শব্দকে ইটালিয়ান মনে করে ।
ব্যাপক অর্থে ব্যাংক হলাে এমন একটি আর্থিক মধ্যস্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ( Financial Intermediary ) যা আমানত গ্রহণ করা , ঋণ দেওয়া , ঋণ ও অর্থ সৃষ্টি করা সহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক কাজ সম্পন্ন করে থাকে । যেমন : বানিজ্যিক ব্যাংক , শিল্প ব্যাংক , কৃষি ব্যাংক ইত্যাদি ।
Prof. Cairncross এর মতে ব্যাংক একটি আর্থিক মধ্যস্থ কারবারী প্রতিষ্ঠান , ধার ও ঋণের ব্যবসায়ী ( A bank is a financial intermediary , a dealer in loans and debts )
( খ ) ব্যাংক ব্যবসায়ের প্রকৃতি ব্যাংক একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান যা অর্থের ব্যবসা করে । ব্যাংকের input এবং output উভয়ই হল অর্থ । তাই অন্যান্য ব্যবসায়ের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য ব্যাংক ব্যবসায়ে উপস্থিত থাকলেও এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা ব্যাংকে অন্য ব্যবসা থেকে আলাদা করে । নিচে এ সকল সাধারণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য আলােচনা করা হলাে :
১ ) মালিকানা : ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এক মালিকানা , অংশীদারী বা যৌথ মূলধনী কোম্পানী হতে পারে । এছাড়াও ব্যাংক সরকারী বা বেসরকারী মালিকানাধীন হতে পারে । বাংলাদেশে সরকারী বেসরকারী উভয় ধরনের ব্যাংকই আছে এবং বেসরকারী সকল ব্যাংক লিমিটেড কোম্পানী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ।
২ ) আমানত গ্রহণ ও ফেরত দান : ব্যাংক বিভিন্ন হিসাবে যেমন সঞ্চয়ী , চলতি ও মেয়াদী হিসাবে আমানত গ্রহণ করে এবং আমানতকারীদের দাবী অনুযায়ী তা যথানিয়মে পরিশােধ করে । সাধারণভাবে এটিই ব্যাংকের অন্যতম মূল কাজ ।
৩ ) নিরাপত্তার প্রতীক : ব্যাংক জনগণ বা প্রতিষ্ঠানের অর্থ আমানত হিসাবে গ্রহণ করে ও সংরক্ষণ করে তাই আমানতকারীদের অর্থের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে না পারলে তা জনগণের আস্থা হারায় । তাই ব্যাংক এমন স্থানে অবস্থিত হতে হবে এবং এমনভাবে পরিচালিত হতে হবে যাতে করে আমানতকারীদের আমানত ও ব্যাংকের নিজস্ব সম্পদের যথাযথ নিরপত্তা প্রদান করা যায় ।
৪ ) বিশ্বস্ততার প্রতীক : জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে না পারলে ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ কমতে থাকে । আর আমানতের পরিমাণের উপরে ব্যাংকের স্বচ্ছলতা নির্ভর করে । তাই সৎ ও বিশ্বস্ত না হলে ব্যাংকের উপরে মানুষের আস্থা থাকে না এবং ব্যাংক সফলতা অর্জন করতে পারে না ।
৫) গােপনীয়তার প্রতীক : ব্যাংকের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলাে মক্কেলের যাবতীয় তথ্যের সর্বোচ্চ গােপনীয়তা রক্ষা করা । বিশ্বজুড়ে ব্যাংক সর্বোচ্চ গােপনীয়তা রক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় । অবশ্য সরকার বা অন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাংক হতে মক্কেলের আর্থিক তথ্য পাবার অধিকার রাখে । গােপনীয়তা রক্ষার দিক থেকে সুইস ব্যাংকের সুনাম বিশ্বজোড়া । কারণ এ ব্যাংকটি কোন অবস্থাতেই গ্রাহকের গােপনীয়তা ভঙ্গ করে না ।
৬ ) ঋণ প্রদান : শুধু আমানত গ্রহণ নয় , আমানত হিসাবে পাওয়া অর্থ অন্য পক্ষকে ঋণ হিসেবে দেওয়াও ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ । এজন্য ব্যাংকে ধার ও ঋণের ব্যবসায়ী বলা হয় ।
৭ ) মূলধন গঠন : জনগণ বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্যাংক যে আমানত গ্রহণ করে তার সবটুকু ঋণ হিসাবে বিতরণ না করে এর একটি অংশ ব্যাংক লাভজনক খাতে বিনিয়ােগ করে । এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানত একত্রিত করে একটি বড় অংকের মুলধন তৈরি করে । বিশ্বের সকল দেশেই মুলধন বাজারের অন্যতম সদস্য হিসেবে ব্যাংকগুলাে মুলধন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে ।
১। কেন্দ্রীয় ব্যাংক : যে ব্যাংক সরকারী মালিকানায় ও নিয়ন্ত্রণ থেকে সরকারের ব্যাংক হিসাবে দেশের আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন , মুদ্রা বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে । কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকার বলা হয় । কারণ দেশের প্রতিটি ব্যাংকই কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় । বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম বাংলাদেশ ব্যাংক যা ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ।
২। বাণিজ্যিক ব্যাংক : যে ব্যাংক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে অল্প সুদে জনগণের অর্থ আমানত হিসাবে সংগ্রহ করে এবং বেশি সুদে ঐ অর্থ অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয় তাকে বাণিজ্যিক ব্যাংক বলে । শুধুমাত্র আমানত গ্রহণ ও ঋণ দেওয়া ছাড়াও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাে মক্কেলের পক্ষে অর্থ আদায় ও পরিশােধ করে , অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর ও বিলবাট্টা করে । বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকাভুক্ত হতে পারে অথবা নাও হতে পারে । বাংলাদেশের সােনালী ব্যাংক , অগ্রণী ব্যাংক , প্রাইম ব্যাংক ইত্যাদি এ জাতীয় ব্যাংক ।
৩। বিশেষায়িত ব্যাংক : যে সকল ব্যাংক গ্রাহকদের প্রয়ােজন ও অর্থনীতির বিশেষ কোনাে দিক নিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা কওে তাকে বিশেষায়িত ব্যাংক বলে । যেমন – কৃষি ব্যাংক , শিল্প ব্যাংক , বিনিয়ােগ ব্যাংক , সমবায় ব্যাংক ইত্যাদি ।
১। একক ব্যাংক : যে ব্যাংক কেবল মাত্র একটি অফিসের মাধ্যমে যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে তাকে একক ব্যাংক বলে । এ ধরনের ব্যাংকের কোথাও কোন শাখা থাকে না । বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোন একক ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়নি , তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ব্যাংকই একক ব্যাংক ।
২। শাখা ব্যাংক : যে ব্যাংক একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অধীনে দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে একই নামে অনেকগুলাে শাখা প্রতিষ্ঠা করে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে তাকে শাখা ব্যাংক বলে । বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে শাখা ব্যাংক ব্যবস্থার আওতাধীন ।
৩। চেইন ব্যাংক : যে ব্যাংক ব্যবস্থায় একাধিক ব্যাংক তাদের নিজস্ব মুলধন , কর্মচারী ও স্বাধীন সত্তা বজায় রেখে পারস্পরিক সমঝােতা ও সহযােগিতার ভিত্তিতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে তাকে চেইন ব্যাংক বলে । চেইন ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য হলাে এক জাতীয় ব্যাংকগুলাের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযােগিতা এড়িয়ে চলা । সাধারণত চেইন ব্যাংকের আওতাধীন ব্যাংকগুলাের পরিচালনা বাের্ডে মালিকাণাগত কারণে একই ব্যক্তি বা পরিবারের অংশগ্রহণ দেখা যায় । ফলে এমনিতেই ব্যাংকগুলাের মধ্যে সহযােগিতার মনােভাব তৈরী হয় । বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি ।
৪। গ্রুপ ব্যাংক : যখন কোন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেই কতকগুলাে ছােট ছােট ব্যাংক গঠন করে অথবা একাধিক ব্যাংকের অধিকাংশ শেয়ার কিনে নিয়ে তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তখন তাকে গ্রুপ ব্যাংকিং বলে । এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী ঐ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে হােল্ডিং কোম্পানি এবং সদস্য ছােট ব্যাংকগুলােকে সাবসিডিয়ারী কোম্পানী বলে । অর্থাৎ হােল্ডিং কোম্পানী ও সাবসিডিয়ারী কোম্পানীর সমন্বয়ে গ্রুপ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ।
( ঙ ) অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকের গুরুত্ব একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে কয়টি বিষয়ের উপরে নির্ভরশীল ব্যাংক ব্যবস্থা তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নই দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে । ব্যাংক ব্যবস্থা দেশের কৃষি , শিল্প , প্রযুক্তি , বাণিজ্য সকল ক্ষেত্রের উন্নয়নেই প্রভাব বিস্তার করে থাকে । নিচে এরকম কিছু বিশেষ গুরুত্ব বা ভূমিকা আলােচনা করা হলােঃ
১ ) সঞ্চয় সংগ্রহ , মূলধন গঠন ও বিনিয়ােগ : ব্যাংকগুলাে বিভিন্নভাবে জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ করে বড় ধরনের মূলধন গঠন করে এবং তা কৃষি , শিল্প , প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে
২ ) বিনিময়ের মাধ্যম সৃষ্টি : ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের বিনিময় মাধ্যম সৃষ্টি করে আর্থিক বিনিময়কে সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত করায় খুব সহজেই দেশ থেকে দেশে অল্প সময়ে ব্যবসায়ীক দেনা পাওনা পরিশােধ করা সম্ভব হচ্ছে । যেমন চেক , পে - অর্ডার , ড্রাফট ইত্যাদি অর্থের মতােই বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ।
৩ ) জীবন যাত্রার মানােন্নয়ন ব্যাংক বিনিময় বৃদ্ধির মাধ্যমে মােট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে । যা মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে দেয় এবং জীবন যাত্রার মান বাড়িয়ে দেয় । এ ছাড়া ভােগ্য পণ্যের জন্য ঋণ সহায়তা দিয়ে ব্যাংক মানুষের জীবন মান উন্নয়নে সহায়তা করে ।
৪ ) বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ : বাংলাদেশের আমদানী ও রপ্তানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণে বিভিন্ন ব্যাংক নানাবিধ সহযােগিতা প্রদান করে থাকে যেমনঃ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থ সংস্থান , আন্তর্জাতিক দেনা পাওনা পরিশােধে সহযােগিতা করা , বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় ও বৈদেশিক বাজার বিশ্লেষণে প্রয়ােজনীয় তথ্য ও পরামর্শ প্রদান । এক্ষেত্রে EXIM Bank একটি বিশেষায়িত ব্যাংক । এছাড়াও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাের Foreign Exchange Division এ জাতীয় দায়িত্ব পালন করে থাকে ।
৫ ) ঋণ প্রদান
৬ ) অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা
৭ ) কৃষি উন্নয়ন ৮ ) শিল্প উন্নয়ন
৯ ) বেকার সমস্যার সমাধান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ১০ ) সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি
সবশেষে বলা যায় বাংলাদেশের মতাে উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকগুলাে বিশেষ ভূমিকা রাখছে । আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবসায়ের উন্নতির পাশাপাশি সামগ্ৰীক অর্থনীতি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে ।



Leave a Comment