এমাইনমেন্টের শিরােনামঃ ১৯৪৭ সালে ভারত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রেক্ষাপট আলােচনা
- ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন।
- দ্বি-জাতি তত্ত্ব।
- লাহোর প্রস্তাব
- ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন।
১৯৬৫ সালের ভারত শাসন আইন:
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। স্বায়ত্তশাসন বলতে বুঝায় স্বশাসন। শব্দগত অর্থে তাই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলতে বুঝায় প্রদেশের নিজস্ব শাসন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন কথাটির অর্থ আরও ব্যাপক। সংবিধানের আওতায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থেকে প্রাদেশিক সরকার পরিচালনার ক্ষমতাকেই তারা প্রাদশিক স্বায়ত্তশাসন বলে অভিহিত করেছেন। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা তিনটি নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যেমন :
১। আইন প্রণয়ন ও শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রদেশগুলাে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকবে এবং সেই সাথে প্রাদেশিক আইন সভা প্রাদেশিক সরকারেরও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে। অর্থাৎ সংবিধানে প্রদেশের জন্য যে বিষয়গুলাে নিদিষ্ট করে দেওয়া হবে সেগুলাে পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক সরকারের উপর কোনরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
২। প্রদেশগুলােতে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। প্রাদেশিক আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনে মন্ত্রিসভা তাদের কাজের জন্য আইন সভার কাছে দায়ী থাকবে।
৩। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রদেশগুলােকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। জাতীয় সম্পদ ও রাজস্ব বন্টনের ক্ষেত্রে এমন নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে যেন কোন প্রদেশকে আর্থিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়।
দ্বিজাতি তত্ত্ব:
জাতিতত্ত্বের বিশ্লেষণে একটি জনগােষ্ঠীকে তখনই জাতি বলা যায়, যার ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, মনন, কৃষ্টি, ধর্ম এমনকি অর্থনীতি একটি একক সত্তায় পরিণতি লাভ করে। তবে মুসলিম লীগ সভাপতি এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের হিন্দু ও মুসলমান এ দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় দুটি পৃথক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এটিই মূলত জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব' বা 'Two Nations Theory' র মূলকথা।
তিনি ধর্মীয় দিককে প্রাধান্য দিয়েই তাঁর জাতি তত্ত্ব দাঁড় করান। ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহাের অধিবেশনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাবধারা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছিলেন "We maintain and hold that Muslim and Hindus are two major nations by any definition or text of a nation. We are nation of a hundred million and, what is more, we are a nation with our own distinctive culture and civilization, language and literature, art and architecture, customs, history and traditions, aptitudes and ambitions. In short, we have our own distinctive outlook on life and of life." অর্থাৎ “আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, জাতি তত্ত্বের যে কোনাে সংজ্ঞা বিচারে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি প্রধান ভিন্ন জাতি। ভারতের দশ কোটি মুসলমান জনগণ যাদের রয়েছে নিজস্ব স্বতন্ত্রসংস্কৃতি ও সভ্যতা, ভাষা ও সাহিত্য, শিল্পকলা ও স্থাপত্য, রীতিনীতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এক ও অভিন্ন জীবন পদ্ধতি।”
লাহাের প্রস্তাবের মূল বক্তব্য বা বৈশিষ্ট্য লাহাের প্রস্তাবের মূল বক্তব্য ছিল ?
- ভৌগােলিক দিক থেকে সংলগ্ন এলাকাগুলােকে পৃথক অঞ্চল বলে গণ্য করতে হবে।
- এ সকল অঞ্চলের ভৌগােলিক সীমানা প্রয়ােজনমত পরিবর্তন করে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের যে সকল স্থানে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলাে (Independent States) প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- এ সমস্তস্বাধীন রাষ্ট্রের অংগরাজ্য হবে সার্বভৌম ও | স্বায়ত্তশাসিত।
- ভারতের ও নবগঠিত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক, শাসনতান্ত্রিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা করা হবে।
- দেশের যে-কোনাে ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনায় উক্ত বিষয়গুলােকে মৌলিক নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। লাহাের প্রস্তাবের ভিত্তি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব। আর এই তত্ত্ব অনুসারেই ভারতীয় মুসলমানদের এলিট গােষ্ঠী মুসলমানদে মধ্যে জাগ্রত করে তােলেন আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের অদম্য চেতনা।
- এই আইনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং উভয়ই ডােমিনিয়নের মর্যাদা লাভ করে।
- এ আইনে বাংলা ও পাঞ্জাব এ দুটো প্রদেশকে হিন্দু ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা হয়। এ ব্যাপারে সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি কমিশনের কথা বলা হয়।
- দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দুটি পৃথক গণপরিষদ গঠিত হয় এবং শাসনতন্ত্ররচনার ক্ষমতা লাভ করে। গণপরিষদ স্ব-স্ব ডােমিনিয়নের শাসনতন্ত্ররচনার পূর্ব পর্যন্তসার্বভৌম কেন্দ্রীয় আইন পরিষদরূপে কাজ করবে বলে ঘােষিত হয়।
- এ আইনে ভারত ও পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসাবে অবস্থান করবে কিনা সে সম্পর্কে গণপরিষদকে সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
- এ আইনে ভারত সচিব পদের বিলােপ ঘটে এবং রাজকীয় মর্যাদা ও পদ থেকে ভারত ম্রাট’ উপাধি বর্জন করা হয়
- ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারাগুলাের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলাে দেশীয় রাজ্যগুলাের হাতে নিজ অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা প্রদান। এ সব রাজ্য উক্ত আইনে স্বাধীন থাকার কিংবা পাকিস্তান বা ভারতের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তগ্রহণের পূর্ণ অধিকার লাভ করে।
- ব্রিটিশ কমনওয়েলথ সচিবকে ভারত ও পাকিস্তানের সাথে যােগাযােগ রাখার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
- এ আইনে ভারত সচিব কর্তৃক নিযুক্ত কর্মচারিগণকে ডােমিনিয়নদ্বয়ের অধীনে চাকরি করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয় এবং পূর্ববৎ সুযােগ সুবিধা বহাল রাখা হয়।
- ডােমিনিয়নদ্বয়ের গণপরিষদ কর্তৃক স্ব স্ব ডােমিনিয়নের শাসনতন্ত্ররচিত হওয়া পর্যন্তনিম্নলিখিত সংশােধন ও পরিবর্তন সাপেক্ষে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলাে শাসিত হবে।

Leave a Comment